আমি তখন ক্লাস ফোর এ, আর ও থ্রী তে । আমার ছোট বোন আর ও
এক ক্লাস এ পড়ায় ওরা খুব ভালো বান্ধবী ছিল । আমি ছিলাম ক্লাসের
সেকেন্ড বয় । সে যাই হোক, আমরা চার বন্ধু ছিলাম ।
আমি, সিফাত,রিহাদ আর মাহি । দুষ্টুমি আর বাঁদরামিতে আমাদের
কুনো জুড়ি ছিলনা । আমি ছিলাম হিরো ।
সিফাত ছিল প্ল্যানিং মাস্টার, রিহাদ ছিল বুদ্ধি যোগান এ আর মাহি হল সকল
কাজে ভয় দেখানোতে সেরা । তবে হিরো ছিলাম নাম মাত্র, আমি ছিলাম
সিফাতের বুদ্ধির গিনিপিগ । ও নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করত আর
আমাকে দিয়ে এর প্রমাণ যাচাই করত ।
তবে আমার একটা অভ্যাস, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে টস করা ।
যদি শাপলা ওঠে তবে কাজ টা হবে, না হলে কেন্সেল ।
আমাদের বাঁদরামির একটা দৃষ্টান্ত ই এখন তুলে ধরব । ক্লাস ফোর এ থাকতে ই
আমরা প্রেম-ভালবাসা জিনিষটার প্রতি খুব আগ্রহি ছিলাম । আমাদের মধ্যে
প্রতিদিন কথা হতো কার বউ কে হবে এ নিয়ে । ওরা তিনজনের পছন্দ
একেকদিন একেকজন হতো কিন্ত আমার পছন্দ প্রতিদিন একজন কে ঘিরে ই ছিল ।
আর আমরা বন্ধুদের মধ্যে ও তাই ওকে নিয়ে ই কথা হতো সবসময় । আমি
কিভাবে ওকে আমার মনের কথা বলব আর ও কিভাবে তা গ্রহন করবে এ নিয়ে ই
ছিল আমাদের কথাবার্তা । হিন্দি মুভি দেখে দেখে নিজেকে ভালো ই হিরো
মনে করা শুরু করেছিলাম, তাই প্রপজাল রিফিউজ হউয়ার চিন্তা মাথায় ই আসতনা ।
আর সিফাত ! এ বেটা তো প্রতিদিন প্রপোজ করার এক এক সিস্টেম নিয়ে আসতো ।
একবার ঠিক করা হল “ ও যখন স্কুল এ আসবে, তখন সিফাতরা ওকে রাস্তার
মধ্যে আটকিয়ে বলবে আজ আমাদের হাত থেকে তুমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবেনা,
তখন আমি গিয়ে ওকে সিফাত দের হাত থেকে বাঁচাবো ।
“ অ্যাকশান হিরুর ভুমিকা আর কি ।
কিন্তু তাতে আপত্তি হল মাহির “ স্কুলের রাস্তায় কেউ দেখলে অবস্থা খারাপ
করে দেবে, এই ভয় তার । রিহাদ ওকে ধমক দিয়ে বলল- এই চিন্তা তোর করতে
হবেনা, তুই চুপ থাক । সিদ্ধান্ত ফাইনাল । যেদিন প্ল্যান বাস্তবায়ন হবে তার আগের
দিন আমার মনে হল টস করা হয়নি । টস করলাম, উঠলো মানুষ... শেষ সকল প্লান।
সিফাত বেচারার মুখ কাল হয়ে গেল । কিন্তু বেচারা দমে যাওয়ার পাত্র নয়, আরও
কয়েকটা বুদ্ধি বের হয়ে গেল সাথে সাথে ।
আরেকবার প্লান করা হল, আমার বোনের সাথে যখন ও আমাদের বাড়ীতে আসবে,
তখন যেকোনো ভাবে ওকে পুকুরে ফেলে দিতে হবে । তখন ওকে পানি থেকে উদ্ধার
করব আমি, এক সিন এ নায়িকা কাত হয়ে যাবে । মাহি বলে উঠলো “ কিন্তু যদি মারা যায়?
তুই যদি তুলতে না পারিস ? “ রিহাদ বলল ‘ তোর ভয় পেতে হবেনা, আমরা তো আছি,
ও যদি তুলতে না পারে, আমরা সাহায্য করব । প্ল্যান ফাইনাল । কিন্তু এখানে ও বাধ
সাধল সেই কয়েন টস ।
আরেকবার রিহাদ প্ল্যান দিল টিফিন পিরিয়ডে ওর বইয়ের ভেতরে চুপিচুপি চিঠি
রেখে আসতে । বাসায় গিয়ে ও বই খুলে ই আমার চিঠি দেখবে, আমার কথা ভাবতে
ভাবতে ওর সারারাত ঘুম হবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি...।
তখন বাঁধা দিলাম আমি , চুপিচুপি এভাবে চিঠি রেখে আসা কাপুরুষের কাজ ।
বীরপুরুষকে ই সবাই ভালবাসবে । প্রেম যখন করেছি ই, তখন চুপিচুপি চিঠি না
দিয়ে বীরপুরুষের মতো ই সরাসরি হাতে ফুল তুলে দেব, আর বলব ।। “ এই আপন
তোমার সত্যিকারের আপন হতে চায় মম ।“
ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে ই গেছিলাম, আমার নাম আপন, আর এতক্ষন যার কথা
হচ্ছিলো উনার নাম মম ।
অতঃপর আমার প্ল্যান এর বেপারে টস করা হল, বাহ! শাপলা রানী উঠে আসলেন ।
তাই সিদ্ধান্ত ও ফাইনাল হল । পরের ২ দিন বিকেলে খেলা বাদ দিয়ে প্ল্যানিং করা হল
কিভাবে কি করা হবে,বলা হবে এ নিয়ে ।
সব ঠিকঠাক । তো পরদিন স্কুল ছুটির পর ওকে দেখে ডাক দিলাম, “এই মম “
- কি হয়েছে ?
আমার হার্ট তখন মোটর সাইকেলের মতো দৌড়াতে শুরু করল । কেমন যেন লজ্জা লজ্জা
ভয় লাগলো । তারউপর ওর পাশে ই আমার বোন দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
এখন যদি আমি হিরোর রুল নেই, তাহলে বোন গিয়ে বাসায় সব বলে দেবে । তখন মাথার
ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো –“ দৌড় লাগা আপন, দৌড় লাগা । “ কিন্তু দৌড় দিলে
আবার আমার বীরপুরুষ খেতাব কাপুরুষ খেতাবে রূপ নিতে দেরি হবেনা । ধীরে ধীরে
বললাম- কিছু না, যাও মম ।
তারপর ওইদিন কুনমতে বেঁচে আসলাম । বন্ধু গুলা দিল সেইরকমের ঝাড়ি ।
প্রেস্টিজ একদম শেষ আমার ।পরে মনে মনে ঠিক করলাম, আমার দ্বারা মুখে বলা হবেনা ।
চিঠি ই লিখতে হবে, আর বীরদর্পে সেই চিঠিটা হাতে তুলে দিতে হবে । তবে বন্ধুদের কিছু ই
জানালাম না । যা করার একা ই করতে হবে । টস করা হল, এবার ও সব ঠিকঠাক ।
অতঃপর পরদিন সুন্দর একটা কাগজে নীল কালির কলম দিয়ে লিখলাম –
“ আমি তোমাকে ভালোবাসি মম , এই আপন কে তুমি তোমার সত্যিকারের আপন করে নাও ।“
ঠিক করা হল ছুটির পর ই দেব চিঠিটা । আর আমার সৌভাগ্য বশত; ওইদিন আমার বোন
আসেনি স্কুল এ । ছুটি হবার কিছুক্ষন পূর্বে আমি কি মনে করে যেন চিঠিতে অনেকগুলা
কালার পেন দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দিলাম । চিঠিটা সুন্দর হল কি না জানিনা ,
তবে মনে তো শান্তি পেলাম । ভালোবাসা প্রকাশে মনে শান্তি পেলে ই হল ।
ছুটির ঘণ্টা আর বুকের ঘণ্টা একসাথে বাজতে লাগলো । কুনমতে চিঠিটা ওর হাতে দিয়ে
বললাম,” বাড়িতে গিয়ে পরবা ।“ বলে ই দিলাম এক ছুট । পরদিন কুনো এক অজানা
ভয়ে স্কুল এ ই গেলাম না । তারপরদিন স্কুল এ গিয়ে দেখি, সবাই আমার দিকে কেমন যেন
চোর চোর ভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে আছে । আল্লাহ ই জানে, সবাই কি আমার প্রেম কাহিনী জেনে
গেল নাকি ।! বন্ধুদের জিজ্ঞেশ করলাম, ওরা কিছু জানেনা । উল্টা আমারে ঝাড়ি দিল,
ওদের না বলে এ কাজ করতে গেলাম কেন ।
টিফিন পিরিয়ডের সময় বাংলা স্যার ডেকে পাঠালেন । বুকে দুরুদুরু ভয় নিয়ে হাজির
হলাম স্যার এর রুমে । স্যার শুধু একটা কথা ই জিজ্ঞেশ করলো – “ বাসায় কি বলে
দিতে হবে যে, তোমার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে ?? “ আমি তো গেলাম থ হয়ে ।
কুনমতে জবাব দিলাম “ না স্যার । “
আর তারপর ই শুরু হল স্যার এর লেকচার । এমনিতে ই স্যার এর ক্লাস ই আমার
ভালো লাগতনা, তারুপর এই লেকচার গুলা সইতে হল । শেষমেশ স্যার কে কথা দিতে
হল যে আর কুনোদিন এমন করবোনা ।
সিফাতদের কাছে গিয়ে ঘোষণা দিলাম যে, আমার দ্বারা এই সব প্রেম ভালবাসা হবেনা ।
সিফাত বলল- “ হবেনা মানে? আরে তরে দিয়া ই তো সব হবে । তুই কি এমন কুনো
কাহিনী দেখেছিস যেখানে নায়ক ভিলেনের হাতের মার না খেয়ে ই নায়িকা কে জয় করে ?
দেখিস নাইতো ? তাইলে ই বুঝ । এবার তুই ধরে নে যে, তোর কাহিনী তে স্যার ই
ভিলেন, স্যার এর ঝাড়িটুকুকে তুই মার হিসেবে ধরে নে । এখন তোর প্রেম সফল হবে ই দেখে নিস । “
আমি আশার আলো দেখতে পেলাম , তবে বললাম – “ কিন্তু আমি যে স্যার কে কথা দিয়েছি
আমি আর এসব করবনা । “
রিহাদ বলল-“ আরে ! কথা তো দেয়া ই হয় না রাখার জন্য ।“
সিফাত বলল – এবার শোন, তুই আজ ই মমকে বলবি “ ভালবাস না বললেই হতো, স্যার এর
কাছে বলার কি দরকার ছিল ? খামাখা স্যার এত কষ্ট করে বকা দিলেন । যাই হোক, স্যার
আমাকে বকা দেয়ায় আমি আবার ও বুঝতে পারলাম যে, আমি সত্যি সত্যি ই তোমাকে ভালোবাসি ।
আশা করি তুমি কুনো একদিন আমাকে বুঝতে পারবে । “ এইটুকু বলে ই চলে আসবি ।
তারপর দেখবি মজা ।
ওইদিন মমকে বললাম কথা গুলো । কি বুঝল কে জানে ! চোখের কোনে জল দেখলাম ।
পরদিন থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হল । পরীক্ষা থাকায় কিছু ই ঘটলনা কয়েকদিন ।
পরীক্ষার পর ই আমাদের পরিবারের সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে আসি শহরে । আমার তখন কি কষ্ট ।
কাউকে বলতে ও পারিনা, কিছু করতে ও পারিনা ।
এখন আছি গ্রামের বাড়িতে । মমর বড় বোনের বিয়ে । ঠিক আধ ঘণ্টা আগে মম নামের
মেয়েটি আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে গেছে , এতক্ষন ধরে কাগজ টা নিয়ে ভাবছি কিন্তু
মর্ম উদ্ধার করতে পারছিনা, আর ওকে ও খুঁজে পাচ্ছিনা ।
আমরা শহরে যাবার কয়েকবছর পর মমরা ও শহরে চলে আসে । কিন্তু বাসা অনেক দূরে
হওয়ায় মমর সাথে আমার বোনের ফোনে কথা হলে দেখা হয়নি কখনো । আমার ও যে
মাঝেমাঝে কথা বলতে ইচ্ছা হতোনা, তা কিন্তু নয় । যখন আমি ক্লাস এইট নাইন এ পড়তাম,
তখন ছোটবেলার ওই কাহিনী তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে অনেক হাসাহাসি করতাম ।
কিন্তু যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি, তখন অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকালেই কেন যেন ওর
কথা মনে পড়ত খুব । অনেকবার ইচ্ছা করত যে, আমার বোন কে বলি যেন মমকে আমাদের
বাসায় আসতে বলে । কিন্তু পারতাম না এটা বলতে ।
একবছর আগে, যখন আমার বোনের আর ওর ইন্টারমিডিয়েট এর রেজাল্ট বের হয়, তখন
আমার একবার সুযোগ হয় ওকে দেখার । বোন কে নিয়ে আর রেজাল্টের মিষ্টি নিয়ে গেলাম
ওদের বাসায় । ওকে প্রথম দেখে আমি আর চোখ ফেরাতে পারছিলামনা । ক্লাস থ্রি তে পড়া
সেই ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা যে এত তাড়াতাড়ি এত বড় হয়ে উঠবে কে ভেবেছিলো । আর সৃষ্টিকর্তা
যাকে এমন রূপ দিয়েছেন, তার রুপের প্রশংসা কেউ ই করতে পারেনা, আমি ও পারলাম না ।
ওইদিন সারা টা দিন আমি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম ।
২-৩ মাস পর ও আসল আমাদের বাসায় বেড়াতে । এরপর থেকে ওর সাথে আমার বোনের
সম্পর্ক আবার ছোটবেলার মতো হয়ে গেল । ও যখন তখন আমাদের বাসায় আসত ।
আমার বোন ও যেত । আমার সাথে ও ওর টুকটাক কথা হতে লাগলো । কিন্তু ওর কথা
শুনে মনে হতোনা যে ওর ছোটবেলার কুনো কথা মনে আছে । কিন্তু আমি তো কিছুই ভুলতে
পারিনি । আমার কেন যেন মনে হয় আমি এখনও তাকে ভালোবাসি । তার দাওয়াতে ই ওর
বোনের বিয়েতে আসলাম । এখনও চিঠি বা চিরকুট যা বলেন, সেটা হাতে নিয়ে বসে আছি ।
কিন্তু কিছু ই বুঝতে পারছিনা । মানুষ বোধহয় অবাক হলে চিন্তা করার শক্তি ও হারিয়ে ফেলে ।
আমি ও হারিয়ে ফেলেছি । চিঠিতে লিখা –
“ আপন যদি আপন হয়, তবেই আপন পৃথিবী,
আর আপন যদি হয়না আপন, তবে ই পর সব ই । “
এই ২টা লাইনের মর্ম উদ্ধার করতে আমার অবস্থা কাহিল । আর এ কাহিল অবস্থা থেকে
বাঁচাতে ই যেন কুত্থেকে সিফাতের উদয় হল ।
- কিরে ? হাতে এটা কি? প্রেম পত্র নাকি ?
- জানি না দোস্ত
সিফাত কাগজ টা নিয়ে পড়ল । বলল
- কে দিসে ? মম না কি ?
- হুম
- তাইলে বেটা এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন ? যা তাড়াতাড়ি
- মানে কি ? কই যাব ?
- বেটা ! মম তরে ডাকতেছে । ও আমার ভাবি হতে চায় । হাহাহাহা
- সত্যি বলছিস ?
- তাইলে আর কি ? দৌড় লাগা
- ওকে, গেলাম । ওই যে দেখা যাচ্ছে মম কে আঁধারে দাড়িয়ে আছে ।
যাবার সময় সিফাত ডাক দিয়ে বলল – কিরে ? টস করবিনা ?
- ও হ্যাঁ হ্যাঁ । টস তো করা হয়নি । কর তাড়াতাড়ি ।
সিফাত কয়েন ছুরল উপর দিকে । কয়েন টা ঘুরছে । সাথে আমার মাথায় ও কি যেন
ঘুরতে লাগলো । ও কয়েন টা ধরার আগে ই আমি ধরে ফেললাম । ও প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে
তাকাল । আমি বললাম –
“ জীবনের সকল সিদ্ধান্তে যে টস করতে হবে, তার তো কুনো কথা নেই । কিছু কিছু
ব্যাপারে ভাগ্য কে নয়, মন কে ই অগ্রাধিকার দিতে হয় । “
তারপর অন্ধকারে দাঁড়ানো পরীর দিকে ছুটে গেলাম । শেষ প্রহরে তাকে পাওয়া হল তাহলে...।
এক ক্লাস এ পড়ায় ওরা খুব ভালো বান্ধবী ছিল । আমি ছিলাম ক্লাসের
সেকেন্ড বয় । সে যাই হোক, আমরা চার বন্ধু ছিলাম ।
আমি, সিফাত,রিহাদ আর মাহি । দুষ্টুমি আর বাঁদরামিতে আমাদের
কুনো জুড়ি ছিলনা । আমি ছিলাম হিরো ।
কাজে ভয় দেখানোতে সেরা । তবে হিরো ছিলাম নাম মাত্র, আমি ছিলাম
সিফাতের বুদ্ধির গিনিপিগ । ও নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করত আর
আমাকে দিয়ে এর প্রমাণ যাচাই করত ।
তবে আমার একটা অভ্যাস, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে টস করা ।
যদি শাপলা ওঠে তবে কাজ টা হবে, না হলে কেন্সেল ।
আমাদের বাঁদরামির একটা দৃষ্টান্ত ই এখন তুলে ধরব । ক্লাস ফোর এ থাকতে ই
আমরা প্রেম-ভালবাসা জিনিষটার প্রতি খুব আগ্রহি ছিলাম । আমাদের মধ্যে
প্রতিদিন কথা হতো কার বউ কে হবে এ নিয়ে । ওরা তিনজনের পছন্দ
একেকদিন একেকজন হতো কিন্ত আমার পছন্দ প্রতিদিন একজন কে ঘিরে ই ছিল ।
আর আমরা বন্ধুদের মধ্যে ও তাই ওকে নিয়ে ই কথা হতো সবসময় । আমি
কিভাবে ওকে আমার মনের কথা বলব আর ও কিভাবে তা গ্রহন করবে এ নিয়ে ই
ছিল আমাদের কথাবার্তা । হিন্দি মুভি দেখে দেখে নিজেকে ভালো ই হিরো
মনে করা শুরু করেছিলাম, তাই প্রপজাল রিফিউজ হউয়ার চিন্তা মাথায় ই আসতনা ।
আর সিফাত ! এ বেটা তো প্রতিদিন প্রপোজ করার এক এক সিস্টেম নিয়ে আসতো ।
একবার ঠিক করা হল “ ও যখন স্কুল এ আসবে, তখন সিফাতরা ওকে রাস্তার
মধ্যে আটকিয়ে বলবে আজ আমাদের হাত থেকে তুমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবেনা,
তখন আমি গিয়ে ওকে সিফাত দের হাত থেকে বাঁচাবো ।
“ অ্যাকশান হিরুর ভুমিকা আর কি ।
কিন্তু তাতে আপত্তি হল মাহির “ স্কুলের রাস্তায় কেউ দেখলে অবস্থা খারাপ
করে দেবে, এই ভয় তার । রিহাদ ওকে ধমক দিয়ে বলল- এই চিন্তা তোর করতে
হবেনা, তুই চুপ থাক । সিদ্ধান্ত ফাইনাল । যেদিন প্ল্যান বাস্তবায়ন হবে তার আগের
দিন আমার মনে হল টস করা হয়নি । টস করলাম, উঠলো মানুষ... শেষ সকল প্লান।
সিফাত বেচারার মুখ কাল হয়ে গেল । কিন্তু বেচারা দমে যাওয়ার পাত্র নয়, আরও
কয়েকটা বুদ্ধি বের হয়ে গেল সাথে সাথে ।
আরেকবার প্লান করা হল, আমার বোনের সাথে যখন ও আমাদের বাড়ীতে আসবে,
তখন যেকোনো ভাবে ওকে পুকুরে ফেলে দিতে হবে । তখন ওকে পানি থেকে উদ্ধার
করব আমি, এক সিন এ নায়িকা কাত হয়ে যাবে । মাহি বলে উঠলো “ কিন্তু যদি মারা যায়?
তুই যদি তুলতে না পারিস ? “ রিহাদ বলল ‘ তোর ভয় পেতে হবেনা, আমরা তো আছি,
ও যদি তুলতে না পারে, আমরা সাহায্য করব । প্ল্যান ফাইনাল । কিন্তু এখানে ও বাধ
সাধল সেই কয়েন টস ।
আরেকবার রিহাদ প্ল্যান দিল টিফিন পিরিয়ডে ওর বইয়ের ভেতরে চুপিচুপি চিঠি
রেখে আসতে । বাসায় গিয়ে ও বই খুলে ই আমার চিঠি দেখবে, আমার কথা ভাবতে
ভাবতে ওর সারারাত ঘুম হবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি...।
তখন বাঁধা দিলাম আমি , চুপিচুপি এভাবে চিঠি রেখে আসা কাপুরুষের কাজ ।
বীরপুরুষকে ই সবাই ভালবাসবে । প্রেম যখন করেছি ই, তখন চুপিচুপি চিঠি না
দিয়ে বীরপুরুষের মতো ই সরাসরি হাতে ফুল তুলে দেব, আর বলব ।। “ এই আপন
তোমার সত্যিকারের আপন হতে চায় মম ।“
ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে ই গেছিলাম, আমার নাম আপন, আর এতক্ষন যার কথা
হচ্ছিলো উনার নাম মম ।
অতঃপর আমার প্ল্যান এর বেপারে টস করা হল, বাহ! শাপলা রানী উঠে আসলেন ।
তাই সিদ্ধান্ত ও ফাইনাল হল । পরের ২ দিন বিকেলে খেলা বাদ দিয়ে প্ল্যানিং করা হল
কিভাবে কি করা হবে,বলা হবে এ নিয়ে ।
সব ঠিকঠাক । তো পরদিন স্কুল ছুটির পর ওকে দেখে ডাক দিলাম, “এই মম “
- কি হয়েছে ?
আমার হার্ট তখন মোটর সাইকেলের মতো দৌড়াতে শুরু করল । কেমন যেন লজ্জা লজ্জা
ভয় লাগলো । তারউপর ওর পাশে ই আমার বোন দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
এখন যদি আমি হিরোর রুল নেই, তাহলে বোন গিয়ে বাসায় সব বলে দেবে । তখন মাথার
ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো –“ দৌড় লাগা আপন, দৌড় লাগা । “ কিন্তু দৌড় দিলে
আবার আমার বীরপুরুষ খেতাব কাপুরুষ খেতাবে রূপ নিতে দেরি হবেনা । ধীরে ধীরে
বললাম- কিছু না, যাও মম ।
তারপর ওইদিন কুনমতে বেঁচে আসলাম । বন্ধু গুলা দিল সেইরকমের ঝাড়ি ।
প্রেস্টিজ একদম শেষ আমার ।পরে মনে মনে ঠিক করলাম, আমার দ্বারা মুখে বলা হবেনা ।
চিঠি ই লিখতে হবে, আর বীরদর্পে সেই চিঠিটা হাতে তুলে দিতে হবে । তবে বন্ধুদের কিছু ই
জানালাম না । যা করার একা ই করতে হবে । টস করা হল, এবার ও সব ঠিকঠাক ।
অতঃপর পরদিন সুন্দর একটা কাগজে নীল কালির কলম দিয়ে লিখলাম –
“ আমি তোমাকে ভালোবাসি মম , এই আপন কে তুমি তোমার সত্যিকারের আপন করে নাও ।“
ঠিক করা হল ছুটির পর ই দেব চিঠিটা । আর আমার সৌভাগ্য বশত; ওইদিন আমার বোন
আসেনি স্কুল এ । ছুটি হবার কিছুক্ষন পূর্বে আমি কি মনে করে যেন চিঠিতে অনেকগুলা
কালার পেন দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দিলাম । চিঠিটা সুন্দর হল কি না জানিনা ,
তবে মনে তো শান্তি পেলাম । ভালোবাসা প্রকাশে মনে শান্তি পেলে ই হল ।
ছুটির ঘণ্টা আর বুকের ঘণ্টা একসাথে বাজতে লাগলো । কুনমতে চিঠিটা ওর হাতে দিয়ে
বললাম,” বাড়িতে গিয়ে পরবা ।“ বলে ই দিলাম এক ছুট । পরদিন কুনো এক অজানা
ভয়ে স্কুল এ ই গেলাম না । তারপরদিন স্কুল এ গিয়ে দেখি, সবাই আমার দিকে কেমন যেন
চোর চোর ভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে আছে । আল্লাহ ই জানে, সবাই কি আমার প্রেম কাহিনী জেনে
গেল নাকি ।! বন্ধুদের জিজ্ঞেশ করলাম, ওরা কিছু জানেনা । উল্টা আমারে ঝাড়ি দিল,
ওদের না বলে এ কাজ করতে গেলাম কেন ।
টিফিন পিরিয়ডের সময় বাংলা স্যার ডেকে পাঠালেন । বুকে দুরুদুরু ভয় নিয়ে হাজির
হলাম স্যার এর রুমে । স্যার শুধু একটা কথা ই জিজ্ঞেশ করলো – “ বাসায় কি বলে
দিতে হবে যে, তোমার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে ?? “ আমি তো গেলাম থ হয়ে ।
কুনমতে জবাব দিলাম “ না স্যার । “
আর তারপর ই শুরু হল স্যার এর লেকচার । এমনিতে ই স্যার এর ক্লাস ই আমার
ভালো লাগতনা, তারুপর এই লেকচার গুলা সইতে হল । শেষমেশ স্যার কে কথা দিতে
হল যে আর কুনোদিন এমন করবোনা ।
সিফাতদের কাছে গিয়ে ঘোষণা দিলাম যে, আমার দ্বারা এই সব প্রেম ভালবাসা হবেনা ।
সিফাত বলল- “ হবেনা মানে? আরে তরে দিয়া ই তো সব হবে । তুই কি এমন কুনো
কাহিনী দেখেছিস যেখানে নায়ক ভিলেনের হাতের মার না খেয়ে ই নায়িকা কে জয় করে ?
দেখিস নাইতো ? তাইলে ই বুঝ । এবার তুই ধরে নে যে, তোর কাহিনী তে স্যার ই
ভিলেন, স্যার এর ঝাড়িটুকুকে তুই মার হিসেবে ধরে নে । এখন তোর প্রেম সফল হবে ই দেখে নিস । “
আমি আশার আলো দেখতে পেলাম , তবে বললাম – “ কিন্তু আমি যে স্যার কে কথা দিয়েছি
আমি আর এসব করবনা । “
রিহাদ বলল-“ আরে ! কথা তো দেয়া ই হয় না রাখার জন্য ।“
সিফাত বলল – এবার শোন, তুই আজ ই মমকে বলবি “ ভালবাস না বললেই হতো, স্যার এর
কাছে বলার কি দরকার ছিল ? খামাখা স্যার এত কষ্ট করে বকা দিলেন । যাই হোক, স্যার
আমাকে বকা দেয়ায় আমি আবার ও বুঝতে পারলাম যে, আমি সত্যি সত্যি ই তোমাকে ভালোবাসি ।
আশা করি তুমি কুনো একদিন আমাকে বুঝতে পারবে । “ এইটুকু বলে ই চলে আসবি ।
তারপর দেখবি মজা ।
ওইদিন মমকে বললাম কথা গুলো । কি বুঝল কে জানে ! চোখের কোনে জল দেখলাম ।
পরদিন থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হল । পরীক্ষা থাকায় কিছু ই ঘটলনা কয়েকদিন ।
পরীক্ষার পর ই আমাদের পরিবারের সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে আসি শহরে । আমার তখন কি কষ্ট ।
কাউকে বলতে ও পারিনা, কিছু করতে ও পারিনা ।
এখন আছি গ্রামের বাড়িতে । মমর বড় বোনের বিয়ে । ঠিক আধ ঘণ্টা আগে মম নামের
মেয়েটি আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে গেছে , এতক্ষন ধরে কাগজ টা নিয়ে ভাবছি কিন্তু
মর্ম উদ্ধার করতে পারছিনা, আর ওকে ও খুঁজে পাচ্ছিনা ।
আমরা শহরে যাবার কয়েকবছর পর মমরা ও শহরে চলে আসে । কিন্তু বাসা অনেক দূরে
হওয়ায় মমর সাথে আমার বোনের ফোনে কথা হলে দেখা হয়নি কখনো । আমার ও যে
মাঝেমাঝে কথা বলতে ইচ্ছা হতোনা, তা কিন্তু নয় । যখন আমি ক্লাস এইট নাইন এ পড়তাম,
তখন ছোটবেলার ওই কাহিনী তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে অনেক হাসাহাসি করতাম ।
কিন্তু যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি, তখন অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকালেই কেন যেন ওর
কথা মনে পড়ত খুব । অনেকবার ইচ্ছা করত যে, আমার বোন কে বলি যেন মমকে আমাদের
বাসায় আসতে বলে । কিন্তু পারতাম না এটা বলতে ।
একবছর আগে, যখন আমার বোনের আর ওর ইন্টারমিডিয়েট এর রেজাল্ট বের হয়, তখন
আমার একবার সুযোগ হয় ওকে দেখার । বোন কে নিয়ে আর রেজাল্টের মিষ্টি নিয়ে গেলাম
ওদের বাসায় । ওকে প্রথম দেখে আমি আর চোখ ফেরাতে পারছিলামনা । ক্লাস থ্রি তে পড়া
সেই ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা যে এত তাড়াতাড়ি এত বড় হয়ে উঠবে কে ভেবেছিলো । আর সৃষ্টিকর্তা
যাকে এমন রূপ দিয়েছেন, তার রুপের প্রশংসা কেউ ই করতে পারেনা, আমি ও পারলাম না ।
ওইদিন সারা টা দিন আমি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম ।
২-৩ মাস পর ও আসল আমাদের বাসায় বেড়াতে । এরপর থেকে ওর সাথে আমার বোনের
সম্পর্ক আবার ছোটবেলার মতো হয়ে গেল । ও যখন তখন আমাদের বাসায় আসত ।
আমার বোন ও যেত । আমার সাথে ও ওর টুকটাক কথা হতে লাগলো । কিন্তু ওর কথা
শুনে মনে হতোনা যে ওর ছোটবেলার কুনো কথা মনে আছে । কিন্তু আমি তো কিছুই ভুলতে
পারিনি । আমার কেন যেন মনে হয় আমি এখনও তাকে ভালোবাসি । তার দাওয়াতে ই ওর
বোনের বিয়েতে আসলাম । এখনও চিঠি বা চিরকুট যা বলেন, সেটা হাতে নিয়ে বসে আছি ।
কিন্তু কিছু ই বুঝতে পারছিনা । মানুষ বোধহয় অবাক হলে চিন্তা করার শক্তি ও হারিয়ে ফেলে ।
আমি ও হারিয়ে ফেলেছি । চিঠিতে লিখা –
“ আপন যদি আপন হয়, তবেই আপন পৃথিবী,
আর আপন যদি হয়না আপন, তবে ই পর সব ই । “
এই ২টা লাইনের মর্ম উদ্ধার করতে আমার অবস্থা কাহিল । আর এ কাহিল অবস্থা থেকে
বাঁচাতে ই যেন কুত্থেকে সিফাতের উদয় হল ।
- কিরে ? হাতে এটা কি? প্রেম পত্র নাকি ?
- জানি না দোস্ত
সিফাত কাগজ টা নিয়ে পড়ল । বলল
- কে দিসে ? মম না কি ?
- হুম
- তাইলে বেটা এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন ? যা তাড়াতাড়ি
- মানে কি ? কই যাব ?
- বেটা ! মম তরে ডাকতেছে । ও আমার ভাবি হতে চায় । হাহাহাহা
- সত্যি বলছিস ?
- তাইলে আর কি ? দৌড় লাগা
- ওকে, গেলাম । ওই যে দেখা যাচ্ছে মম কে আঁধারে দাড়িয়ে আছে ।
যাবার সময় সিফাত ডাক দিয়ে বলল – কিরে ? টস করবিনা ?
- ও হ্যাঁ হ্যাঁ । টস তো করা হয়নি । কর তাড়াতাড়ি ।
সিফাত কয়েন ছুরল উপর দিকে । কয়েন টা ঘুরছে । সাথে আমার মাথায় ও কি যেন
ঘুরতে লাগলো । ও কয়েন টা ধরার আগে ই আমি ধরে ফেললাম । ও প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে
তাকাল । আমি বললাম –
“ জীবনের সকল সিদ্ধান্তে যে টস করতে হবে, তার তো কুনো কথা নেই । কিছু কিছু
ব্যাপারে ভাগ্য কে নয়, মন কে ই অগ্রাধিকার দিতে হয় । “
তারপর অন্ধকারে দাঁড়ানো পরীর দিকে ছুটে গেলাম । শেষ প্রহরে তাকে পাওয়া হল তাহলে...।

No comments:
Post a Comment