Search This Blog

Sunday, 30 October 2016

স্বপ্নে আঁকা ভালোবাসার গল্প

আমি তখন ক্লাস ফোর এ, আর ও থ্রী তে । আমার ছোট বোন আর ও
এক ক্লাস এ পড়ায় ওরা খুব ভালো বান্ধবী ছিল । আমি ছিলাম ক্লাসের
 সেকেন্ড বয় । সে যাই হোক, আমরা চার বন্ধু ছিলাম ।
 আমি, সিফাত,রিহাদ আর মাহি । দুষ্টুমি আর বাঁদরামিতে আমাদের
কুনো জুড়ি ছিলনা । আমি ছিলাম হিরো ।

সিফাত ছিল প্ল্যানিং মাস্টার, রিহাদ ছিল বুদ্ধি যোগান এ আর মাহি হল সকল
কাজে ভয় দেখানোতে সেরা । তবে হিরো ছিলাম নাম মাত্র, আমি ছিলাম
সিফাতের বুদ্ধির গিনিপিগ । ও নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করত আর
আমাকে দিয়ে এর প্রমাণ যাচাই করত ।
তবে আমার একটা অভ্যাস, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে টস করা ।
যদি শাপলা ওঠে তবে কাজ টা হবে, না হলে কেন্সেল ।
আমাদের বাঁদরামির একটা দৃষ্টান্ত ই এখন তুলে ধরব । ক্লাস ফোর এ থাকতে ই
আমরা প্রেম-ভালবাসা জিনিষটার প্রতি খুব আগ্রহি ছিলাম । আমাদের মধ্যে
 প্রতিদিন কথা হতো কার বউ কে হবে এ নিয়ে । ওরা তিনজনের পছন্দ
একেকদিন একেকজন হতো কিন্ত আমার পছন্দ প্রতিদিন একজন কে ঘিরে ই ছিল ।
আর আমরা বন্ধুদের মধ্যে ও তাই ওকে নিয়ে ই কথা হতো সবসময় । আমি
 কিভাবে ওকে আমার মনের কথা বলব আর ও কিভাবে তা গ্রহন করবে এ নিয়ে ই
 ছিল আমাদের কথাবার্তা । হিন্দি মুভি দেখে দেখে নিজেকে ভালো ই হিরো
মনে করা শুরু করেছিলাম, তাই প্রপজাল রিফিউজ হউয়ার চিন্তা মাথায় ই আসতনা ।
আর সিফাত ! এ বেটা তো প্রতিদিন প্রপোজ করার এক এক সিস্টেম নিয়ে আসতো ।
একবার ঠিক করা হল “ ও যখন স্কুল এ আসবে, তখন সিফাতরা ওকে রাস্তার
মধ্যে আটকিয়ে বলবে আজ আমাদের হাত থেকে তুমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবেনা,
তখন আমি গিয়ে ওকে সিফাত দের হাত থেকে বাঁচাবো ।
 “ অ্যাকশান হিরুর ভুমিকা আর কি ।
কিন্তু তাতে আপত্তি হল মাহির “ স্কুলের রাস্তায় কেউ দেখলে অবস্থা খারাপ
করে দেবে, এই ভয় তার । রিহাদ ওকে ধমক দিয়ে বলল- এই চিন্তা তোর করতে
হবেনা, তুই চুপ থাক । সিদ্ধান্ত ফাইনাল । যেদিন প্ল্যান বাস্তবায়ন হবে তার আগের
 দিন আমার মনে হল টস করা হয়নি । টস করলাম, উঠলো মানুষ... শেষ সকল প্লান।
 সিফাত বেচারার মুখ কাল হয়ে গেল । কিন্তু বেচারা দমে যাওয়ার পাত্র নয়, আরও
কয়েকটা বুদ্ধি বের হয়ে গেল সাথে সাথে ।
আরেকবার প্লান করা হল, আমার বোনের সাথে যখন ও আমাদের বাড়ীতে আসবে,
তখন যেকোনো ভাবে ওকে পুকুরে ফেলে দিতে হবে । তখন ওকে পানি থেকে উদ্ধার
করব আমি, এক সিন এ নায়িকা কাত হয়ে যাবে । মাহি বলে উঠলো “ কিন্তু যদি মারা যায়?
তুই যদি তুলতে না পারিস ? “ রিহাদ বলল ‘ তোর ভয় পেতে হবেনা, আমরা তো আছি,
ও যদি তুলতে না পারে, আমরা সাহায্য করব । প্ল্যান ফাইনাল । কিন্তু এখানে ও বাধ
সাধল সেই কয়েন টস ।
আরেকবার রিহাদ প্ল্যান দিল টিফিন পিরিয়ডে ওর বইয়ের ভেতরে চুপিচুপি চিঠি
রেখে আসতে । বাসায় গিয়ে ও বই খুলে ই আমার চিঠি দেখবে, আমার কথা ভাবতে
ভাবতে ওর সারারাত ঘুম হবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি...।
তখন বাঁধা দিলাম আমি , চুপিচুপি এভাবে চিঠি রেখে আসা কাপুরুষের কাজ ।
বীরপুরুষকে ই সবাই ভালবাসবে । প্রেম যখন করেছি ই, তখন চুপিচুপি চিঠি না
দিয়ে বীরপুরুষের মতো ই সরাসরি হাতে ফুল তুলে দেব, আর বলব ।। “ এই আপন
তোমার সত্যিকারের আপন হতে চায় মম ।“
ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে ই গেছিলাম, আমার নাম আপন, আর এতক্ষন যার কথা
হচ্ছিলো উনার নাম মম ।
অতঃপর আমার প্ল্যান এর বেপারে টস করা হল, বাহ! শাপলা রানী উঠে আসলেন ।
তাই সিদ্ধান্ত ও ফাইনাল হল । পরের ২ দিন বিকেলে খেলা বাদ দিয়ে প্ল্যানিং করা হল
কিভাবে কি করা হবে,বলা হবে এ নিয়ে ।
সব ঠিকঠাক । তো পরদিন স্কুল ছুটির পর ওকে দেখে ডাক দিলাম, “এই মম “
- কি হয়েছে ?
আমার হার্ট তখন মোটর সাইকেলের মতো দৌড়াতে শুরু করল । কেমন যেন লজ্জা লজ্জা
ভয় লাগলো । তারউপর ওর পাশে ই আমার বোন দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
এখন যদি আমি হিরোর রুল নেই, তাহলে বোন গিয়ে বাসায় সব বলে দেবে । তখন মাথার
ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো –“ দৌড় লাগা আপন, দৌড় লাগা । “ কিন্তু দৌড় দিলে
আবার আমার বীরপুরুষ খেতাব কাপুরুষ খেতাবে রূপ নিতে দেরি হবেনা । ধীরে ধীরে
 বললাম- কিছু না, যাও মম ।
তারপর ওইদিন কুনমতে বেঁচে আসলাম । বন্ধু গুলা দিল সেইরকমের ঝাড়ি ।
প্রেস্টিজ একদম শেষ আমার ।পরে মনে মনে ঠিক করলাম, আমার দ্বারা মুখে বলা হবেনা ।
চিঠি ই লিখতে হবে, আর বীরদর্পে সেই চিঠিটা হাতে তুলে দিতে হবে । তবে বন্ধুদের কিছু ই
জানালাম না । যা করার একা ই করতে হবে । টস করা হল, এবার ও সব ঠিকঠাক ।
অতঃপর পরদিন সুন্দর একটা কাগজে নীল কালির কলম দিয়ে লিখলাম –
“ আমি তোমাকে ভালোবাসি মম , এই আপন কে তুমি তোমার সত্যিকারের আপন করে নাও ।“
ঠিক করা হল ছুটির পর ই দেব চিঠিটা । আর আমার সৌভাগ্য বশত; ওইদিন আমার বোন
আসেনি স্কুল এ । ছুটি হবার কিছুক্ষন পূর্বে আমি কি মনে করে যেন চিঠিতে অনেকগুলা
কালার পেন দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দিলাম । চিঠিটা সুন্দর হল কি না জানিনা ,
 তবে মনে তো শান্তি পেলাম । ভালোবাসা প্রকাশে মনে শান্তি পেলে ই হল ।
ছুটির ঘণ্টা আর বুকের ঘণ্টা একসাথে বাজতে লাগলো । কুনমতে চিঠিটা ওর হাতে দিয়ে
বললাম,” বাড়িতে গিয়ে পরবা ।“ বলে ই দিলাম এক ছুট । পরদিন কুনো এক অজানা
ভয়ে স্কুল এ ই গেলাম না । তারপরদিন স্কুল এ গিয়ে দেখি, সবাই আমার দিকে কেমন যেন
চোর চোর ভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে আছে । আল্লাহ ই জানে, সবাই কি আমার প্রেম কাহিনী জেনে
গেল নাকি ।! বন্ধুদের জিজ্ঞেশ করলাম, ওরা কিছু জানেনা । উল্টা আমারে ঝাড়ি দিল,
ওদের না বলে এ কাজ করতে গেলাম কেন ।
টিফিন পিরিয়ডের সময় বাংলা স্যার ডেকে পাঠালেন । বুকে দুরুদুরু ভয় নিয়ে হাজির
 হলাম স্যার এর রুমে । স্যার শুধু একটা কথা ই জিজ্ঞেশ করলো – “ বাসায় কি বলে
দিতে হবে যে, তোমার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে ?? “ আমি তো গেলাম থ হয়ে ।
কুনমতে জবাব দিলাম “ না স্যার । “
আর তারপর ই শুরু হল স্যার এর লেকচার । এমনিতে ই স্যার এর ক্লাস ই আমার
ভালো লাগতনা, তারুপর এই লেকচার গুলা সইতে হল । শেষমেশ স্যার কে কথা দিতে
হল যে আর কুনোদিন এমন করবোনা ।
সিফাতদের কাছে গিয়ে ঘোষণা দিলাম যে, আমার দ্বারা এই সব প্রেম ভালবাসা হবেনা ।
 সিফাত বলল- “ হবেনা মানে? আরে তরে দিয়া ই তো সব হবে । তুই কি এমন কুনো
কাহিনী দেখেছিস যেখানে নায়ক ভিলেনের হাতের মার না খেয়ে ই নায়িকা কে জয় করে ?
 দেখিস নাইতো ? তাইলে ই বুঝ । এবার তুই ধরে নে যে, তোর কাহিনী তে স্যার ই
ভিলেন, স্যার এর ঝাড়িটুকুকে তুই মার হিসেবে ধরে নে । এখন তোর প্রেম সফল হবে ই দেখে নিস । “

আমি আশার আলো দেখতে পেলাম , তবে বললাম – “ কিন্তু আমি যে স্যার কে কথা দিয়েছি
আমি আর এসব করবনা । “
রিহাদ বলল-“ আরে ! কথা তো দেয়া ই হয় না রাখার জন্য ।“
সিফাত বলল – এবার শোন, তুই আজ ই মমকে বলবি “ ভালবাস না বললেই হতো, স্যার এর
 কাছে বলার কি দরকার ছিল ? খামাখা স্যার এত কষ্ট করে বকা দিলেন । যাই হোক, স্যার
আমাকে বকা দেয়ায় আমি আবার ও বুঝতে পারলাম যে, আমি সত্যি সত্যি ই তোমাকে ভালোবাসি ।
 আশা করি তুমি কুনো একদিন আমাকে বুঝতে পারবে । “ এইটুকু বলে ই চলে আসবি ।
তারপর দেখবি মজা ।
ওইদিন মমকে বললাম কথা গুলো । কি বুঝল কে জানে ! চোখের কোনে জল দেখলাম ।
 পরদিন থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হল । পরীক্ষা থাকায় কিছু ই ঘটলনা কয়েকদিন ।
পরীক্ষার পর ই আমাদের পরিবারের সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে আসি শহরে । আমার তখন কি কষ্ট ।
কাউকে বলতে ও পারিনা, কিছু করতে ও পারিনা ।
এখন আছি গ্রামের বাড়িতে । মমর বড় বোনের বিয়ে । ঠিক আধ ঘণ্টা আগে মম নামের
মেয়েটি আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে গেছে , এতক্ষন ধরে কাগজ টা নিয়ে ভাবছি কিন্তু
 মর্ম উদ্ধার করতে পারছিনা, আর ওকে ও খুঁজে পাচ্ছিনা ।
আমরা শহরে যাবার কয়েকবছর পর মমরা ও শহরে চলে আসে । কিন্তু বাসা অনেক দূরে
হওয়ায় মমর সাথে আমার বোনের ফোনে কথা হলে দেখা হয়নি কখনো । আমার ও যে
মাঝেমাঝে কথা বলতে ইচ্ছা হতোনা, তা কিন্তু নয় । যখন আমি ক্লাস এইট নাইন এ পড়তাম,
তখন ছোটবেলার ওই কাহিনী তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে অনেক হাসাহাসি করতাম ।
 কিন্তু যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি, তখন অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকালেই কেন যেন ওর
কথা মনে পড়ত খুব । অনেকবার ইচ্ছা করত যে, আমার বোন কে বলি যেন মমকে আমাদের
বাসায় আসতে বলে । কিন্তু পারতাম না এটা বলতে ।
একবছর আগে, যখন আমার বোনের আর ওর ইন্টারমিডিয়েট এর রেজাল্ট বের হয়, তখন
আমার একবার সুযোগ হয় ওকে দেখার । বোন কে নিয়ে আর রেজাল্টের মিষ্টি নিয়ে গেলাম
ওদের বাসায় । ওকে প্রথম দেখে আমি আর চোখ ফেরাতে পারছিলামনা । ক্লাস থ্রি তে পড়া
সেই ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা যে এত তাড়াতাড়ি এত বড় হয়ে উঠবে কে ভেবেছিলো । আর সৃষ্টিকর্তা
যাকে এমন রূপ দিয়েছেন, তার রুপের প্রশংসা কেউ ই করতে পারেনা, আমি ও পারলাম না ।
ওইদিন সারা টা দিন আমি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম ।
২-৩ মাস পর ও আসল আমাদের বাসায় বেড়াতে । এরপর থেকে ওর সাথে আমার বোনের
সম্পর্ক আবার ছোটবেলার মতো হয়ে গেল । ও যখন তখন আমাদের বাসায় আসত ।
আমার বোন ও যেত । আমার সাথে ও ওর টুকটাক কথা হতে লাগলো । কিন্তু ওর কথা
শুনে মনে হতোনা যে ওর ছোটবেলার কুনো কথা মনে আছে । কিন্তু আমি তো কিছুই ভুলতে
পারিনি । আমার কেন যেন মনে হয় আমি এখনও তাকে ভালোবাসি । তার দাওয়াতে ই ওর
বোনের বিয়েতে আসলাম । এখনও চিঠি বা চিরকুট যা বলেন, সেটা হাতে নিয়ে বসে আছি ।
কিন্তু কিছু ই বুঝতে পারছিনা । মানুষ বোধহয় অবাক হলে চিন্তা করার শক্তি ও হারিয়ে ফেলে ।
আমি ও হারিয়ে ফেলেছি । চিঠিতে লিখা –
“ আপন যদি আপন হয়, তবেই আপন পৃথিবী,
আর আপন যদি হয়না আপন, তবে ই পর সব ই । “
এই ২টা লাইনের মর্ম উদ্ধার করতে আমার অবস্থা কাহিল । আর এ কাহিল অবস্থা থেকে
বাঁচাতে ই যেন কুত্থেকে সিফাতের উদয় হল ।
- কিরে ? হাতে এটা কি? প্রেম পত্র নাকি ?
- জানি না দোস্ত
সিফাত কাগজ টা নিয়ে পড়ল । বলল
- কে দিসে ? মম না কি ?
- হুম
- তাইলে বেটা এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন ? যা তাড়াতাড়ি
- মানে কি ? কই যাব ?
- বেটা ! মম তরে ডাকতেছে । ও আমার ভাবি হতে চায় । হাহাহাহা
- সত্যি বলছিস ?
- তাইলে আর কি ? দৌড় লাগা
- ওকে, গেলাম । ওই যে দেখা যাচ্ছে মম কে আঁধারে দাড়িয়ে আছে ।
যাবার সময় সিফাত ডাক দিয়ে বলল – কিরে ? টস করবিনা ?
- ও হ্যাঁ হ্যাঁ । টস তো করা হয়নি । কর তাড়াতাড়ি ।
সিফাত কয়েন ছুরল উপর দিকে । কয়েন টা ঘুরছে । সাথে আমার মাথায় ও কি যেন
ঘুরতে লাগলো । ও কয়েন টা ধরার আগে ই আমি ধরে ফেললাম । ও প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে
 তাকাল । আমি বললাম –
“ জীবনের সকল সিদ্ধান্তে যে টস করতে হবে, তার তো কুনো কথা নেই । কিছু কিছু
ব্যাপারে ভাগ্য কে নয়, মন কে ই অগ্রাধিকার দিতে হয় । “
তারপর অন্ধকারে দাঁড়ানো পরীর দিকে ছুটে গেলাম । শেষ প্রহরে তাকে পাওয়া হল তাহলে...।

Friday, 28 October 2016

সম্পর্ক


BY- Parinita Rituparna


উফফ! সবাই যেভাবে আমাকে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে! অবশ্য দেখবে নাই বা কেন, দেখতে তো আমাকে সার্কাস পার্টির জোকার বা যাত্রাপালার অভিনেত্রীদের চেয়ে কোনো অংশে কম লাগছে না! ওদের আর কী দোষ, মজা পেলে মজাতো লুটবেই! রাগে আমার গা রি রি করছে। বিরক্ত লাগে একদম। জীবনে কিছুতো নিজের ইচ্ছে মত করতে পারলাম না, সবকিছুতেই শুধু শুনেছি একটিই কথা, 'মা, ওতটুকু করার তো সাধ্যে নেই'! প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট পেতাম, কিন্তু পরে আর কিছু বলতামই না, কারণ আমার ওই বাক্যটি শুনতে অসহ্য লাগত। যাই হোক, সেসব কথা বলে আর লাভ নেই, কথা হলো বিয়ে নিয়ে সব মেয়েরই একটা আলাদা স্বপ্ন থাকে। আমার ও ছিল, তবে বেশি কিছু না, চেয়েছিলাম বিয়ের সাজটা পারসোনায় সাজতে। চাওয়াটা কি খুব বেশি ই ছিল? কিন্তু না, সেটা ও পূরণ হলো না, শুধু না, না, আর না। অসহ্য লাগে এখন সবকিছু। কোথাকার কোন সঙের পার্লারে নিয়েছে, সঙ সাজিয়েছে আমায়। অনুষ্ঠানটা যত তাড়াতাড়ি শেষ ততই মঙ্গল। দম আটকে আসছে আমার এখানে .... একবার শ্বশুর বাড়ি যাই, তারপর আর কখনোই এই অভাবের ঘরমুখো হব না। শুনেছি বর নাকি ভালো একটা জব করে, আশা রাখি সেখানে আমার সব ইচ্ছে পূরণ হবে ..…
ঘরে তেমন আসবাব নেই, তবে খুব সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সবকিছু। মৃদু আলো জ্বলায় বাকি জিনিস ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। অবশ্য জিনিস কম থাকলে ভালোই, আমার পছন্দ মত সব সাজাতে পারবো। ফুল ছড়ানো খাটে বসে আছি, আর চেষ্টা করছি পুরো ঘরটা বোঝার। একটা প্ল্যান ও মাথায় সাজিয়ে ফেলেছি কিভাবে সাজাবো ঘরটা। উপরে ফ্যান ঘুরছে, সাথে একটা এসি হলে মন্দ হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঘরে ঢুকেছে, খেয়াল করিনি। খেয়াল করলাম তার সম্বোধনে -
- 'আপনাকে কিছু কথা বলার ছিল আমার' .…
(হুম! আদিখ্যেতা দেখিয়ে আপনি ডাকা হচ্ছে! আজকালকার ছেলে হয়ে আসছে ফর্মালিটি দেখাতে!) মনের মধ্যে বেজে চলেছে কথাগুলো, কিন্তু সেটা বাহির পর্যন্ত এগোতে পারলো না। ফর্মালিটি দেখিয়ে বলয়লাম, 'বলুন'
- জানি না কথাটা আপনার কেমন লাগবে, তবে নিজের দিক থেকে ক্লিয়ার থাকা ভালো। দেখুন, আপনি হয়ত অনেক সুখ সাচ্ছন্দ্যে বড় হয়েছেন, কোনো কিছুর অভাব বোধ করেননি, যা চেয়েছেন পেয়েছেন, কিন্তু এখানে হয়্তো আপনার একটু কষ্ট হয়ে যাবে। না মানে, আমি বলছি না যে আপনাকে কষ্ট পেতে হবে, আসলে জবের এমাউন্টটা ভালই, কথা হলো, মানে যা বলতে চাচ্ছিলাম আর কি, এই যে ফ্ল্যাটটা দেখছেন, সেটার পিছনে অনেক খরচ হয়েছে। বাবার পেনশান, জমি বিক্রির টাকা আর অফিসের থেকে নেয়া এডভান্স। অফিস থেকে যা নিয়েছি তাতো পুষিয়ে দিতে হবে, তাই বলছিলাম কি একটু কষ্ট করে যদি ম্যানেজ করে নিতে পারেন..… ঝামেলাটা মিটে গেলেই আর কোনো সমস্যা নেই।
মাথার ভিতরের টেম্পারেচারটা এতক্ষণ ১ ডিগ্রি করে বাড়ছিল, কিন্তু শেষ হওয়ার পর পুরো হাই লেভেলে গেল। ভিতরে ব্রেইনটা সিদ্ধ হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। কী বলা উচিত জানি না, শুধু চুপচাপ বসে রইলাম। আশ্চর্য! সব শুধু আমার সাথেই কেন! আমাকেই কেন শুধু ভুক্তভোগী হতে হবে? কিছুই কি নিজের মত করে করতে পারব না, চাইতে পারব না! ধ্যাৎ! বিরক্তি এসে গেলো সবকিছুর উপর .…
##
সারাদিন আমার তেমন কোনো কাজ নেই। ব্রেকফাস্ট হওয়ার পর সে যায় অফিসে, আর মা-বাবা যায় তাদের ঘরে। আমি মাঝে মাঝে যাই তাদের সাথে গল্প করতে, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকি না, কারণ ভালো লাগে না। তারপর দুপুরের রান্না সেরে তো আমি পুরোই বেকার। অলস সময় কাটে আমার। আমাদের পুরো এপার্টমেন্টটা অনেক বড়- ২০ তলা। আজ মনে হলো সবার সাথে একটু পরিচিত হলে ভালো হয়, তাই পাশের ফ্ল্যাট থেকেই শুরু করলাম।
- আরে! পাশের বাসার ভাবী যে! আসেন, আসেন ...
ভালো লাগলো মহিলার ব্যবহার। ড্রইং রুমে ঢুকে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পছন্দের তারিফ না করে পারলাম না। শুরু থেকে শেষ পরযন্ত আভিজাত্যের ছোঁয়া স্পস্ত। কথায় কথায় জানতে পারলাম তার হাজব্যান্ড ব্যাবসা করে, বাইং হাউস। বুঝতে পারলাম তাদের টাকার অভাব নেই। দুই ছেলে, নিশ্চিন্তের সংসার। হঠাৎ করে মনটা খারাপ হয়ে গেল, চলে এলাম নিজের ঘরে। নিজের ইচ্ছেতাকে বোধ হয় আর বাস্তব করা হবে না।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, একটা গন্ধ নাকে আসায় ঘুমটা ভেঙে গেলো। তাকিয়ে দেখি ঘরে রজনীগন্ধা ফুল রাখা। ফুল আমার এমনিতে পছন্দ হলেও এখন ভালো লাগছে না। বারান্দায় গেলাম মন ভালো করতে, হলো না। আসলে ভালো লাগছে না আর এখানে, তাই আবার চলে গেলাম পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীর বাসায়।
##
এখন আমি সময় পেলেই পাশের ফ্ল্যাটে চলে যাই, ভাবির সাথে কত যে গল্প করি, ভালোই লাগে। আজ ভাবি তার গহনার কালেকশান দেখিয়েছেন। উফফ! কি যে সুন্দর!...... জোস একটা কালেকশান আছে বটে। এখন আর এসব ভেবে দুঃখ করি না, কারণ মনকে মানিয়ে নিয়েছি। যেটা পাব না সেটা নিয়ে ভেবে কি লাভ! থাক না .........।
এভাবেই কাটছিলো সময়, এভাবেই কেটে যেত যদি না সেদিন এমনটি না হতো। সেদিনের পর থেকে আমার কাছে লাইফের মিনিংসটাই পালটে গেলো। জীবনের আসল জিনিসটাই যেন পেয়ে গেলাম।
বই পড়ার অভ্যেস আমার, তাই রাতের খাওয়া শেষে একটা বই পড়ছিলাম। হঠাৎ কানে এলো কান্নার আওয়াজ। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখি শব্দটা পাশের ফ্ল্যাট থেকেই আসছে। সেখানে গিয়ে দেখি ভাবী বারবার শুধু মূর্ছা যাচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে জানতে পারলাম, কোনো এক প্রোগ্রাম থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আর তাতে তার মহামূল্যবান ডায়মন্ডের নেকলেসটি হারাতে হয়। সেই শোকে তার এই অবস্থা। তার হাজব্যান্ড ও দেখি তাকে দোষারোপ করছে আর টাকার জন্য বিলাপ করছে। আমি তাদের কিছু বলতে পারলাম না, চলে এলাম।
ঝিম মেরে বসে ছিলাম খাটে, ভাবতে পারছিলাম না মানুষ এতটা বুদ্ধিভ্রষ্ট কিভাবে হয়! যেখানে তাদের প্রাণটাই চলে যেতে পারতো সেখানে সামান্য একটা নেকলেসের জন্য তারা ......... নিজের প্রাণের চেয়েও টাকাটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি দামি! আরে, নিজের প্রাণটাই যদি না থাকে, তো এসব কার জন্য! না, আর ভাবতে পারছি না এসব। 
খাট থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রথম ড্রয়ার - না, তেমন কিছু নেই তাতে, কিন্তু অনেক কিছুই আছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু। হুম, আর তা হলো, মুঠোভরতি ভালোবাসা, যা এতদিন ছিল আমার বোধগম্যের বাইরে। আমার বর আমার জন্যে প্রতিদিন বিভিন্নরকম ফুল আনত আর আমি তা আগ্রাহ্য করতাম। এতদিন ভাবতাম টাকাপয়সাই সব, কিন্তু আজ সেসব মিথ্যে হয়ে গেলো। আসলে টাকাপয়সা অঢেল পরিমাণে না থাকলেও কখনো ভালবাসার অভাব হয় নি, যথেষ্ট পরিমাণ সুখেই ছিলাম, আর এখন থেকে প্রতিদিন ই থাকবো। ভালবাসার সুখ সবার কপালে জুটে না, আর আমি কিনা! 
না, না, এতো বোকা আমি না।

নীরব ভালোবাসা --- A Silent Love Story


এটা একটা বাংলাদেশের কোন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে ও একটি মেয়ের নীরব প্রেমের গল্প। মেয়ের পরিবার চিরাচরিত নিয়মে ছেলেটাকে গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বাভাবিকভাবেই মেয়ের পরিবার মেয়েটাকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে ছেলেটার খুব একটা ব্রাইট ফিউচার নেই, তার সাথে সম্পর্ক রাখাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।

পরিবারের চাপে পড়ে একদিন মেয়েটা ছেলেটাকে বলে, "আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কতটা গভীর? তুমি একটা কিছু অন্তত করো। তাছাড়া আমাদের সম্পর্ক কেউ মেনে নিবে না।" ছেলেটা কোন উত্তর খুঁজে পায় না। সে চুপ করে থাকে। মেয়েটা রাগ হয়ে চলে যায়। তারপরেও স্বপ্নবিলাসী ছেলেটা তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিছুটা অন্জন'দা এর গানের মতো, "সাদা-কালো এই জন্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে, তোমার-আমার লাল-নীল সংসার।"

ছেলেটা একদিন হায়ার-স্টাডিসের জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যাওয়ার আগ-মুহূর্তে সে মেয়েটাকে বলে, "আমি হয়তো কথায় খুব একটা পারদর্শী না, কিন্তু আমি জানি যে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তারপরেও তুমি যদি চাও, তোমার-আমার বিয়ের কথা আমি তোমার পরিবারকে একবার বলে দেখতে পারি। তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন কাটাতে রাজি আছ?" 

মেয়েটা ছেলের দৃঢ়-সংকল্প দেখে রাজি হয়। ছেলেটা মেয়ের পরিবারকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করে ফেলে। তারপর তাদের এনগেজমেন্ট হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশে ফিরলে তারপর তাদের বিয়ে হবে। এরপর ছেলেটা চলে যায় দেশের বাইরে।

মেয়েটা একটা অফিসে জব করা শুরু করে দেয়। এদিকে ছেলেটাও তার রিসার্চ-ওয়ার্ক নিয়ে দেশের বাইরে ব্যস্ত। তারপরেও তারা শত ব্যস্ততার মাঝেও ফোন আর ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের ভালোবাসার অনুভূতি যতটা সম্ভব আদান-প্রদান করে।

একদিন মেয়েটা অফিসে যাওয়ার পথে রোড-অ্যাক্সিডেন্ট করে। সেন্স ফিরে সে দেখতে পায় যে সে হাসপাতালে ভর্তি এবং বুঝতে পারে যে সে মারাত্মকভাবে আহত। তার বাবা-মাকে বিছানার পাশে দেখতে পায় সে। তার মা কান্না করতেছে তা বুঝতে পেরে যখন মেয়েটা কথা বলতে যায় তখন সে বুঝতে পারে যে তার বাকশক্তি লোপ পেয়েছে। ডাক্তারের ভাষ্যমতে মেয়েটা তার ব্রেনে আঘাত পাওয়ায় আজীবনের মতো বোবা হয়ে গেছে।

একসময় মেয়েটা খানিকটা সুস্থ হয়ে বাসায় চলে আসে। এদিকে ছেলেটা তাকে বার বার ফোন করতে থাকে কিন্তু মেয়েটা বোবা বলে তার করার কিছুই থাকে না। মেয়েটা একদিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। সে তার কথোপোকথন-হীন এই জীবনের সাথে ছেলেটাকে আর জড়াতে চায় না। 
তার ফলশ্রুতিতে সে একদিন একটা মিথ্যা চিঠিতে লেখে যে সে আর ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না। তারপর মেয়েটা চিঠির সাথে তার এনজেজমেন্ট রিং ছেলেটার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। ছেলেটা মেয়েটাকে হাজার-হাজার ই-মেইল করে কিন্তু তার কোন রিপ্লাই সে পায় না। ছেলেটা শত-শত বার ফোন করে কিন্তু মেয়েটার ফোন রিসিভ না করে নীরবে কান্না করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

একদিন মেয়েটার পরিবার বাসা বদল করে অন্য কোন এলাকায় নতুন কোন একটা পরিবেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যাতে করে মেয়েটা কিছুটা হলেও এই দুঃস্মৃতী ভূলে যায় এবং সুখে থাকে। 

নতুন পরিবেশে মেয়েটা "সাইন-ল্যাংগুয়েজ" শেখে এবং নতুন জীবন শুরু করে। বছর দুয়েক পর একদিন মেয়েটার এক বান্ধবী এখানে চলে আসে এবং মেয়েটাকে বলে যে ছেলেটা দেশে ব্যাক করেছে। মেয়েটা তার বান্ধবীকে রিকুয়েস্ট করে যাতে ছেলেটা কোনভাবেই যেন তার এই অবস্থার কথা জানতে না পারে। তারপর কয়েকদিন পর মেয়েটার বান্ধবী চলে যায়। 

আরো এক বছর পর আবার একদিন মেয়েটার বান্ধবী মেয়েটার কাছে একটা ইনভাইটেশন কার্ড নিয়ে চলে আসে। মেয়েটা কার্ড খুলে দেখতে পায় যে এটা ছেলেটার বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড। মেয়েটা অবাক হয়ে যায় যখন পাত্রীর জায়গায় তার নিজের নাম দেখতে পায়। মেয়েটা যখন তার বান্ধবীর কাছে এ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইবে তখন সে দেখতে পায় যে ছেলেটা তার সামনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা তখন "সাইন ল্যাংগুয়েজ" ব্যবহার করে মেয়েটাকে বলে, "I've spent a year's time to learn sign language. Just to let you know that I've not forgotten our promise. Let me have the chance to be your voice. I Love You." এই বলে ছেলেটা আবার সেই এনগেজমেন্ট রিং মেয়েটাকে পড়িয়ে দেয়। কয়েক বছর পর মেয়েটা আবার হেসে উঠে। এ যেন এক নীরব ভালোবাসার নীরব হাসি।